সর্বশেষ

মানসিক ও শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে শিশুদের

সিয়াম, বয়স ৯। রাজধানীর জুরাইনের আমবাগান এলাকায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন। জ্বর, ঠাণ্ডা না থাকলেও কাশি লেগেই থাকে। মাঝে মাঝে নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। প্রথমে এলাকার ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়ে সেবন করালেও কাশি সারেনি। সিয়ামকে নিয়ে যাওয়া হয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে। সিয়ামের স্বাস্থ্য পরীক্ষা কর দেখা যায় ফুসফুসে সংক্রমণ। চিকিৎসক জানিয়েছেন, দূষিত বায়ুর প্রভাবে এমনটা হচ্ছে। পরীক্ষায় তা উঠে এসেছে।

সিয়ামে মা জানান, বাসার পাশে একটা প্লাস্টিকের জুতা তৈরি কারখানা আছে। সেখান থেকে মেডিসিনের (কেমিক্যাল) গন্ধ আসে। এ ছাড়া রাস্তার ওপাশে চিপস তৈরি ফ্যাক্টরি। সব সময় কালো ধোঁয়া আসে। মাঝেমধ্যে জানালা বন্ধ করে রাখি। কিন্তু বাচ্চাদের কতক্ষণ আটকে রাখা যায়?

ঢাকার বায়ুদূষণ দিন দিন বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। প্রায়ই বিশ্বের শীর্ষ বায়ুদূষণ নগরীর তালিকার শীর্ষে অবস্থান করে ঢাকা। এর ফলে সব বয়সের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বয়স্কদের সহনশীলতার মাত্রা বেশি থাকায় আক্রান্ত কম হয়ে থাকে। এই দূষণের ফলে বেশি আক্রান্ত হয় শিশুরা। তৈরি হয় নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘আইকিউ এয়ার’ দূষিত বাতাসের শহরের তালিকা প্রকাশ করে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক দিন দুর্যোগপূর্ণ বায়ুর মধ্যে কাটিয়েছে ঢাকাবাসী। বছরের প্রথম মাসটির মোট ৯ দিন রাজধানীর বায়ুর মান দুর্যোগপূর্ণ ছিল, যা গত সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বেসরকারি স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৪টি জেলারই বায়ুর মান আদর্শ মাত্রার চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে। আদর্শ মাত্রার মধ্যে আছে মাত্র ১০টি জেলার বায়ুর মান।

ক্যাপসের গবেষণা অনুযায়ী ২০২১ সালে বাংলাদেশের ৬৪ জেলার গড় অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা ছিল প্রতি ঘনমিটারে ১০২.৪১ মাইক্রোগ্রাম, যা দৈনিক আদর্শ মানের চেয়ে প্রায় ১.৫৭ গুণ বেশি। এই অতিরিক্ত বায়ুদূষণের সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়ছে মানুষের প্রজনন ক্ষমতাসহ সার্বিক স্বাস্থ্যের ওপর। বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করছে।

বায়ুদূষণ বিশেষজ্ঞ ও ক্যাপস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। কারণ শিশুদের ফুসফুসের কার্যকারিতা কম।

শিশুদের বেশি আক্রান্তের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, শিশুদের উচ্চতা কম ফলে গাড়ির ধোঁয়া থেকে শুরু করে রাস্তার ধুলা প্রথমে শিশুদের আক্রান্ত করে। দূষিত বায়ু নিচের দিক থেকে প্রথমে শিশুদের নাকে যায়।

তিনি আরও বলেন, বায়ুদূষণের কারণে শিশুরা নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। ফুসফুসে সমস্যা, কাশি, গলায় ইনফেকশনে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া বাতাসে সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। দীর্ঘ সময় আক্রান্ত হলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। বায়ুদূষণের কারণে শিশুরা বাইরে খেলতে যেতে চায় না। বাসার ভেতর ইলেকট্রনিক ডিভাইসে আকৃষ্ট হয়, যা ক্ষতিকর।

বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব বিষয়ে শ্যামলীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার শিল্পী বলেন, বাতাসে বিভিন্ন ধরনের ধূলিকণা থাকে; এসবের পরিমাণ যখন বেড়ে যায় তখন বায়ুদূষণ হয়। বিভিন্ন যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া বাতাসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এসব বিষাক্ত এবং ক্ষতিকর পদার্থ শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে মাধ্যমে ফুসফুসে যাচ্ছে। এতে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রক্তের মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডে চলে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ক্ষতিকর পদার্থ শরীরে প্রবেশের ফলে ফুসফুস, কিডনি, লিভার, হৃৎপিণ্ডে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হয়।

বায়ুদূষণের ফলে শিশুদের ক্ষতিকর প্রভাব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দূষিত বাতাসের ক্ষতিকর দিক শিশুদের সুস্থ রাখতে হবে। কারণ বায়ুদূষণের প্রধান শিকার শিশু। ঢাকার আকাশে বর্তমানে স্মোক (ধোঁয়া) সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ধোঁয়া এবং কুয়াশার মিশ্রণে ভয়ংকর বায়ুদূষণ। নাইট্রোজেন অক্সাইড, ওজোন, সালফার অক্সাইডের মতো বিভিন্ন গ্যাস, কার্বন মনোক্সাইড, সিএফসিসহ আরও কিছু গ্যাসের ক্ষতিকর উপাদান থাকে স্মোকে। এটি শিশুদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এগুলো সরাসরি বাচ্চাদের মস্তিষ্কে চলে যায়। ফলে তাদের মস্তিষ্কের গঠন ঠিকমতো হয় না। মস্তিষ্কের গঠন ঠিক না হলে শারীরিক এবং মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ছোট থেকে বড় সব বয়সীদের জন্যই বায়ুদূষণ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

ইউনিসেফের উদ্যোগে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বা আইসিডিডিআরবি গত ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত এক গবেষণার ফল প্রকাশ করে জানিয়েছে, বাংলাদেশে সাড়ে তিন কোটির বেশি শিশু ক্ষতিকারক সিসা শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছে। বড়দের তুলনায় শিশুদের শরীরে সিসার প্রভাব বেশি। সম্প্রতি এক গবেষণার বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, দেশের চারটি জেলার শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতি এবং তার মধ্যে ৬৫ শতাংশের রক্তে সিসার পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি।

আইসিডিডিআরবির করা গবেষণার তথ্য বলছে, ঢাকার ৫০০ শিশুর রক্ত পরীক্ষায় সবার শরীরেই সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন