দেশে জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১৬ লাখ ৫০ হাজার ১৫৯ জন। যাদের মধ্যে সিংহভাগেরই বসবাস চট্টগ্রাম বা পার্বত্য তিন জেলায়।
সমতলের রাজশাহী, টিলা বেষ্টিত সিলেট ও ময়মনসিংহসহ আরও কিছু বিভাগ বা জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা উপজাতিদের বসবাস রয়েছে। তবে সবসময় নানা কারণেই আলোচিত হচ্ছেন পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা। বিশেষ করে তারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা উপজাতি নাকি আদিবাসী সেই বিতর্কও থাকছে সবসময়। যদিও বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী তাদেরকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবেই উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কোনোভাবেই আদিবাসী বলা বা প্রচার-প্রকাশ করা যাবে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও নানা সুযোগ-সুবিধার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা পাহাড়ি উপজাতিরা নানা কৌশলে নিজেদের ‘আদিবাসী’ নামে প্রতিষ্ঠায় নানা অতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। তাদের সঙ্গে তালমিলিয়ে রাষ্ট্রের সংবিধান ও আইনের বিরুদ্ধে কথা, কাজে ও নানা প্রচেষ্টায় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন কতিপয় সুশীল সমাজের বুদ্ধিজীবীরা। তবে মঙ্গলবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ‘আদিবাসী’ দাবি করে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এমনই এক প্রেক্ষাপটে আজ বুধবার পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, আদিবাসী বলতে যা বোঝায়, সেই অর্থে দেশে কোনো আদিবাসী নেই। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কিছু সংখ্যক লোক নিজেদের আদিবাসী পরিচয় দিতে চায়। তারা প্রত্যেকে মিয়ানমারসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে এখানে বসবাস করছে। আদিবাসী হিসেবে তারা যে স্বীকৃতি চায়, সেটা কোনো বৈশিষ্ট্য দিয়েই তারা প্রমাণ করতে পারবে না। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী ও শান্তিচুক্তি অনুযায়ী আমাদের দেশে আর কারও আদিবাসী বলার সুযোগ নেই। এখন যত দ্রুত এই জনগোষ্ঠী মূল স্রোতের সঙ্গে মিশে নিজেদের উন্নতি করতে পারে সেটা তাদের জন্য ও দেশের জন্য ভালো। এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নেতৃত্বগুলোকে এবং সরকারের দায়িত্বশীলদের সমন্বিত প্রচেষ্টা বা উদ্যোগ নিতে হবে।
জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১৬ লাখ ৫০ হাজার ১৫৯। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা কিছুটা বেশি। এর মধ্যে চাকমাদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারীর সংখ্যা ৮ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮। আর পুরুষের সংখ্যা ৮ লাখ ২৪ হাজার ৭৫১ জন। বিভাগ অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ৯ লাখ ৯০ হাজার ৮৬০, রাজশাহীতে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৯২, সিলেটে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৪ জন, রংপুরে ৯১ হাজার ৭০, ঢাকায় ৮২ হাজার ৩১১, ময়মনসিংহে ৬১ হাজার ৫৫৯, খুলনায় ৩৮ হাজার ৯৯২ ও বরিশালে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী জনসংখ্যা ৪ হাজার ১৮১ জন। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগোষ্ঠী চাকমাদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যা ৪ লাখ ৮৩ হাজার ২৯৯ জন। সংখ্যার দিক দিয়ে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অবস্থানে আছে পার্বত্য চট্টগ্রামেরই দুই জাতিগোষ্ঠী মারমা ও ত্রিপুরা। মারমাদের সংখ্যা ২ লাখ ২৪ হাজার ২৬২ এবং ত্রিপুরাদের সংখ্যা ১ লাখ ৫৬ হাজার ৫৭৮। জনসংখ্যায় চতুর্থ অবস্থানে আছে সমতলের জাতিগোষ্ঠী সাঁওতাল। তাদের সংখ্যা ১ লাখ ২৯ হাজার ৪৯ জন। জানা যায়, সারা দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর প্রায় এক শতাংশের মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকাংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ময়মনসিংহ, সিলেট ও রাজশাহী অঞ্চলে বসবাস করে। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হলো চাকমা। এ ছাড়া রয়েছে গারো, মারমা, ম্রো, খেয়াং, চাক, বম, লুসাই, পাংখোয়া, ত্রিপুরা, সাঁওতাল, মনিপুরী ইত্যাদি। এদিকে সরেজমিন গত সপ্তাহে বান্দরবানে গিয়ে পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালি বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, বর্তমানে কুকি জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে অপতৎপরতা চালানো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘কেএনএফ’, তার আগে থেকে তৎপরতা চালানো জেএসএস (সন্তু), জেএসএস (সংস্কার), ইউপিডিএফ (প্রসীত) ও ইউপিডিএফ (ডেমোক্রেটিক) সহ একাধিক সংগঠনও নানা সময়ে পার্বত্য অঞ্চলকে আলাদা একটি রাজ্য বা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অযৌক্তিক-অবাস্তব দাবি জানিয়ে সশস্ত্র আন্দোলন করে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে নিজেদেরকে ‘আদিবাসী’ হিসেবেও প্রতিষ্ঠার জন্য নানা অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে তারা।
কেএনএফ এখন পার্বত্য অঞ্চলের কিছু অংশ নিয়ে ‘কুকিল্যান্ড’ নামে যে স্বপ্ন দেখছে, সেই একইভাবে জেএসএস বা ইউপিডিএফসহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আঞ্চলিক সংগঠনগুলো পার্বত্য অঞ্চলকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করে ‘জুমল্যান্ড’ গড়ার ষড়যন্ত্রের নীল নকশা প্রকাশ করেছে। সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন পেতে নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবেও প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে এই উপজাতি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। যদিও পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর বসবাসের ইতিহাস সর্বোচ্চ ৩০০-৪০০ বছরের মধ্যেই বলে মনে করেন পাহাড় নিয়ে গবেষণাকারীরা।
এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মির্জা তসলিমা সুলতানা বলেন, ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি পেলে আন্তর্জাতিকভাবেই নানা সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। তাদের কিছু অতিরিক্ত অধিকার সংরক্ষিত হয়। সে কারণেই হয়তো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাসিন্দারা নিজেদের আদিবাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। এটাকে খারাপভাবে নেওয়ার কিছু নেই। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই তারা দখল, নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।
তবে পাহাড়ি উপজাতিদের বসবাসের ইতিহাস কতদিনের এমন প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব এড়িয়ে গিয়ে অধ্যাপক মির্জা তসলিমা সুলতানা বলেন, ‘আমরা বসবাসের ইতিহাসের দিকে যাব না। আগে-পরে বসবাসের হিসাব করে এটা ঠিক করা যাবে না।’
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ইতিহাস যা বলছে : বাংলা উইকিপিডিয়ার মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে জানা যায়, চাকমা বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। চাকমারা মঙ্গোলীয় জাতির একটি শাখা। বর্তমান মিয়ানমারের আরাকানে বসবাসকারী ডাইংনেট জাতিগোষ্ঠীকে চাকমাদের একটি শাখা হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৫৪৬ সালে আরাকান রাজা মেং বেং বার্মার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। আরাকানীদের কাছে পরাজিত হয়ে ওই সময়ে চাকমা জনগোষ্ঠী বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলে আসেন এবং আলেক্যাদংয়ে (বর্তমান আলী কদম) তাদের রাজধানী স্থাপন করেন। পরবর্তীতে আলেক্যাদং থেকে আরও উত্তরে সরে এসে বর্তমান চট্টগ্রাম বিভাগের রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, ফটিকছড়ি উপজেলায় বসতি স্থাপন করেন। অন্যদিকে মারমা সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা প্রথমে ১৬শ শতাব্দীর দিকে অভিবাসন শুরু হলেও মূল অভিবাসন শুরু হয় আরাকান সম্রাট মাংখামাং কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের নিয়োগপ্রাপ্ত ৪৬তম ভাইসরয় মংচপ্রুর (মংচপ্যাইং) আমলে। এ ছাড়া বর্তমানে আলোচিত কুকি নৃগোষ্ঠীও চীনা-তিব্বতী জাতিগোষ্ঠীর একটি ধারা। যারা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলজুড়ে, মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাংশে এবং বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বিস্তৃত। উত্তর-পূর্ব ভারতের শুধু অরুণাচল প্রদেশ ব্যতীত সব রাজ্যে তারা ছড়িয়ে রয়েছে। এই জনগোষ্ঠীর এভাবে আন্তর্জাতিক সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ হচ্ছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি।
