সর্বশেষ

চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস বন্ধ হয় না,বর্ষা এলেই তোড়জোড়

মর্নিং নিউজ ডেস্ক

চট্টগ্রামে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। দীর্ঘ হয় মৃত্যুর মিছিল। কিন্তু পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস বন্ধ হয় না। গত ১৪ বছরে পাহাড় ধসে দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এরপরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ এখানে বসবাস করছেন। বছরের পর বছর এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও দীর্ঘস্থায়ী কোন ব্যবস্থা নেয় না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বরং বর্ষাকালে প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে এসব বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে তোড়জোড় শুরু হয়।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন ১৭টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে ৮৩৫টি পরিবার বসবাস করছে। অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন ১০টি পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা ৫৩১। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মালিকানাধীন সাতটি পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা ৩০৪। এসব পাহাড়ে বসবাসকারীর মানুষের সংখ্যা পাঁচ হাজারের অধিক।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, চট্টগ্রাম নগরে যেসব পাহাড় কাটা হয়েছে তার মধ্যে হিসেব অনুযায়ী ৭৪ শতাংশ পাহাড় শুধু পাঁচলাইশ মৌজাতেই কাটা হয়েছে।

রোববার (১১ জুন) সকাল ১১টায় হোটেল সৈকতের সাঙ্গু হলে আয়োজিত ‘চট্টগ্রাম নগরের পাহাড় কাটা রোধে মতবিনিয়র সভা’য় তিনি এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, হাইকোর্ট এবং সরকারের বিভিন্ন সময়ে জারি হওয়া আদেশ উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি এবং খাগড়াছড়িতে কাটা হয়েছে পাহাড়। পাহাড় কেটে কিভাবে জীববৈচিত্র্য রক্ষা হবে? ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রামে ৩২ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার পাহাড় ছিল।
২০০৮ সালে তা কমে ১৪ দশমিক দুই বর্গকিলোমিটারে নেমে আসে।

সরকারের বিভিন্ন সময়ে জারি হওয়া আদেশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৮৩ সালে সরকারি আদেশ ছিল-চট্টগ্রামের কোথাও কোন পাহাড় কাটা যাবে না। ২০০৭ সালে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল- ‘জাতীয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন ছাড়া পাহাড় কাটা যাবে না’। উচ্চ আদালত ২০১২ সালের ১৯ মার্চ আদেশ জারি করেছিলেন, ‘চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং রাঙ্গামাটিতে কোন পাহাড় কাটা যাবে না। ’

তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন সময়ে জারি করা আদেশ এবং উচ্চ আদালতের রায় উপেক্ষা করেই এই অঞ্চলে পাহাড় কাটা হয়েছে। উচ্ছেদ করা পাহাড়ে আবার গাছ লাগানোর কথাও বলা হয়েছে। পাহাড় কেটে কীভাবে জীববৈচিত্র রক্ষা হবে সেটি আমাদের মাথায় ধরে না।

পাহাড়ে বসবাস করা বেশিরভাগ মানুষই নিম্নআয়ের। স্থানীয় প্রভাবশালীরা টাকার বিনিময়ে নিম্নআয়ের মানুষের ঘর তৈরি করতে নির্বিচারে পাহাড় কাটছে। ফলে বৃষ্টি হলেই পাহাড়ের মাটি ধসে দুর্ঘটনা ঘটছে। এরপর কিছু সময়ের জন্য প্রশাসনের তৎপরতা চোখে পড়ে। সময় যত গড়ায় তৎপরতাও থিতিয়ে যায়।

২০০৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে পাহাড় ধসে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় ২০০৭ সালে। ওই বছরের ১১ জুন টানা বর্ষণের ফলে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালে মারা যান ৩০ জন।

সম্প্রতি মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে পাহাড় ধসে প্রাণহানি এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে লোকজনকে সরিয়ে নিতে অভিযান শুরু করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। নগরীর লালখান বাজার মতিঝর্না, বাটালি পাহাড়, টাংকির পাহাড় এলাকা থেকে প্রায় ২০০ লোককে সরিয়ে নেওয়া হয়। এছাড়া ফিরোজ শাহ এলাকার পাহাড় থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ১২টি পরিবার আত্মীয়-স্বজনের ঘরে আশ্রয়ে নিয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীর মধ্যে রেলওয়ের লেকসিটি আবাসিক এলাকা-সংলগ্ন পাহাড়ে ২২টি পরিবার, পূর্ব ফিরোজ শাহ ১ নম্বর ঝিল-সংলগ্ন পাহাড়ে ২৮টি পরিবার, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন কৈবল্যধাম বিশ্ব কলোনি পাহাড়ে ২৮টি পরিবার, পরিবেশ অধিদফতর-সংলগ্ন সিটি করপোরেশন পাহাড়ে ১০টি পরিবার, রেলওয়ে, সওজ, গণপূর্ত অধিদফতর ও ওয়াসার মালিকানাধীন মতিঝর্ণা ও বাটালি হিলে ১৬২টি পরিবার, ব্যক্তিমালিকানাধীন এ কে খান পাহাড়ে ২৬টি পরিবার, হারুন খানের পাহাড়ে ৩৩টি পরিবার, পলিটেকনিক কলেজ-সংলগ্ন পাহাড়ে ৪৩টি পরিবার, মধুশাহ পাহাড়ে ৩৪টি পরিবার, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট-সংলগ্ন পাহাড়ে ৩৩টি পরিবার, মিয়ার পাহাড়ে ৩২টি পরিবার, আকবর শাহ আবাসিক এলাকা-সংলগ্ন পাহাড়ে ২৮টি পরিবার, আমিন কলোনি-সংলগ্ন টাংকির পাহাড়ে ১৬টি পরিবার, লালখান বাজার জামেয়াতুল উলুম মাদরাসা-সংলগ্ন পাহাড়ে ১১টি পরিবার, ভেড়া ফকিরের পাহাড়ে ১১টি পরিবার, ফয়’স লেক আবাসিক এলাকা-সংলগ্ন পাহাড়ে ৯টি পরিবার এবং এম আর সিদ্দিকী পাহাড়ে ৮টি পরিবার বসবাস করছে। এর বাইরেও ঝুঁকিপূর্ণভাবে অনেকে পাহাড়ে বসবাস করছে।

অভিযোগ আছে, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীরা পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন করলেও প্রশাসনের এ বিষয়ে তেমন নজর নেই। বিশেষ করে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল ছলিমপুর এলাকায় পাহাড় কেটে স্থাপনা তৈরি করে বসবাস করছেন বহু মানুষ।

নুরজাহান নামে একজন বলেন, এক লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে ছলিমপুর এলাকার পাহাড়ে বসবাস শুরু করি। প্রশাসন একবার উচ্ছেদও করে। পরে আবার এখানে ঘর তৈরি করে থাকা শুরু করি। মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, তাই বাধ্য হয়ে এখানে থাকতে হচ্ছে।

পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মনোয়ারা বেগম নামের এক নারী অভিযোগ করেন, “২০০৪ সাল থেকে পুনর্বাসনের কথা শুনে আসছি কিন্তু কিছুই হয়নি। বাসা ভাড়া কম, তাই ঝুঁকি জেনেও এখানে থাকতে হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরীতে পাহাড় কাটার দায়ে ৪৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে সরকারি সংস্থা ও ব্যক্তি রয়েছেন।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক বলেন, পাহাড় কাটা রোধে নিয়মিত মামলা করা হয়। পাশাপাশি জরিমানাও করা হয়। কিন্তু এসব করেও পাহাড় কাটা ঠেকানো যাচ্ছে না।

পরিবেশ নিয়ে কাজ করা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী বলেন, “চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোতে বালি মাটি বেশি। ফলে ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলে পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রামে এক শ্রেণির চিহ্নিত ভূমিদস্যু পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত। যারা পাহাড় দখল করে স্থাপন তৈরির মাধ্যমে ভাড়া আদায় করে। তারা বিভিন্ন দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

তিনি আরও বলেন, “প্রশাসনের লোকজনকে দেখি বছরের ১০ মাস পাহাড় নিয়ে নীরব থাকেন। শুধু মে-জুন এলে পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের নিয়ে কথা বলেন। পাহাড়ে যারা অবৈধভাবে বসবাস করেন তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। একটা শ্রেণি চায় না অবৈধ বসবাসকারীরা পাহাড় থেকে নেমে আসুক। নেমে আসলে পাহাড় দখলের প্রক্রিয়াটা থেমে যাবে। এ কারণে পাহাড়ে যারা অবৈধ স্থাপনা তৈরির সঙ্গে জড়িত তাদের নিবৃত্ত করতে হবে। তা না করা গেলে পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকবে। আর পাহাড়ধসে মারা যাবে নিম্নআয়ের মানুষ”।

আরও পড়ুন