সর্বশেষ

ভিসানীতি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আওয়ামী লীগের এমপি ও নেতারা

যুক্তরাষ্ট্র ভিসানীতি ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা দাবি করে আসছেন যে, বিএনপির ‘অপরাজনীতির’ জন্য বিশ্বের প্রভাবশালী দেশটির এ ব্যবস্থা। তারা বলছেন, বিএনপির জন্যই খড়গ হয়ে উঠবে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি। কিন্তু তাদের এ বক্তব্য আস্থায় নিতে পারছেন না দলটির সংসদ সদস্য (এমপি), স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতারা। ভিসানীতি নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তা ও ‘আতঙ্ক’ কোনোভাবেই দূর করতে পারছেন না দলের ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা।

গত ২৪ মে বাংলাদেশের জন্য ভিসানীতি ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। এ ভিসানীতি অনুযায়ী, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান, সভা-সমাবেশে বাধা দিলে দায়ী ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যদের ভিসা দেবে না যুক্তরাষ্ট্র।

এরপর থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছে। এ ভিসানীতি শুধুই বিএনপির জন্য, এমন বক্তব্য প্রচার করে দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী-সমর্থকদের মনোবল অটুট রাখার চেষ্টা করছেন সরকারি দলের নেতারা। কিন্তু ভিসানীতি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় থাকা আওয়ামী লীগের একটি অংশ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে প্রকৃত বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছে। চলতি সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের (এমপি) লবির আড্ডায়, সংসদ কার্যালয়ের আড্ডা ও অধিবেশন কক্ষে একজন আরেকজনের আসনে গিয়ে ভিসানীতির ব্যাপারে জানতে, বুঝতে চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া কেউ কেউ পছন্দের কেন্দ্রীয় নেতাদের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে গিয়েও ভিসানীতির প্রকৃত রহস্য জানার চেষ্টা করছেন।

জানতে চাইলে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুর রহমান ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটা ঘটনা ঘটলে সেটা ভিন্ন ভিন্নভাবে ছড়ায়। বড় গুজবও সৃষ্টি হয়ে যায়। গ্রামগঞ্জে যারা থাকেন তাদের বোধও দুর্বল। ফলে দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে যায়।’ তবে ভিসানীতি নিয়ে বড় কোনো দুশ্চিন্তার কারণ নেই বলে দাবি করেন তিনি।

একাধিক এমপির সঙ্গে কথা বলে  এ প্রতিবেদক জানতে পেরেছেন ভিসানীতি সম্পর্কে কথা বলে তারা মূলত নিজেদের ভেতরের আতঙ্ক দূর করার চেষ্টা করছেন। একাধিক জায়গায় যেখানে ভিসানীতি নিয়ে এমপিরা নিজেদের ভীতি প্রকাশ করেছেন সেখানে এ প্রতিবেদকও উপস্থিত ছিলেন। ধানমণ্ডিতে দলীয় সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জেলা-উপজেলার নেতারা সাংগঠনিক কাজ নিয়ে ঢাকায় আসেন। কাজ শেষ করে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হলে ভিসানীতি নিয়ে আলাপ করতে চেষ্টা করেন। জানতে চান যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত অবস্থানের কথা। ধানমন্ডির কার্যালয়ে এমন একটি আলোচনায়ও উপস্থিত ছিলেন দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদক।

গত রবিবার আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্যের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে আসেন কুমিল্লা, যশোর, ঝিনাইদহ ও সিলেটের চার এমপি। সাংগঠনিক প্রয়োজনীয় আলাপ সেরে চার এমপিই একসঙ্গে ওই নেতার কাছে প্রশ্ন রাখেন ভিসানীতি নিয়ে। ওই নেতা উত্তর দেন, ‘ভিসানীতি নিয়ে তোমাদের এত উদ্বেগের কারণ কী? পশ্চিমা এ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য আছে? সেকেন্ড হোম গড়েছ?’ তারা উত্তর দেন, এসব কিছুই সেখানে নেই তাদের। ওই নেতা বলেন, ‘শোনো, উদ্বেগ তো আমার থাকার কথা। কিন্তু ভিসানীতি নিয়ে আমার তো কোনো দুশ্চিন্তা নেই। দেখো না, প্রতিদিনই ভিসানীতির বিরুদ্ধে মঞ্চে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছি।’

এমপিদের আতঙ্ক-দুশ্চিন্তা দূর করতে সম্পাদকম-লীর এ নেতা তারপর বলেন, ‘ভিসানীতিতে আমেরিকা বলেছে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে যারা বাধার সৃষ্টি করবেন তাদের বিরুদ্ধে ভিসানীতি খড়গ হবে। নেত্রী (আওয়ামী লীগ সভাপতি) নিজেও চান আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে। বিএনপি চায় নির্বাচন প্রতিহত করতে। ভিসানীতি দুশ্চিন্তার আতঙ্কের তো বিএনপির জন্য, আমার বা তোমাদের জন্য নয়।’

পরে ওই চার এমপি নেতাকে অবহিত করেন, ভেতরে-বাইরে, দলীয় কার্যালয়, সংসদ অধিবেশন কক্ষ ও লবিতে একসঙ্গে তিন/চার এমপি একত্রিত হলেই আলোচনা শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি নিয়ে। তারা সম্পাদকম-লীর ওই সদস্যকে জানান, এ আতঙ্ক শুধু তাদের নয়, দলের সব স্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যেই আছে। এলাকায় গেলে পাড়া-মহল্লা, চায়ের দোকান সবখানেই এই এক আলোচনা ভিসানীতি কার বিরুদ্ধে।

গত বৃহস্পতিবার ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে গেলে দেখা যায়, টাঙ্গাইল, বরিশাল, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকজন নেতাকর্মী সাংগঠনিক কাজে সেখানে এসেছেন। চলে যাওয়ার সময় উপস্থিত এক সভাপতিমণ্ডলী ও সম্পাদকমণ্ডলীর আরেক নেতার দেখা পান তৃণমূলের নেতারা। কেন্দ্রীয় দুই নেতার সঙ্গে চা খেতে বসেন তারা। কেন্দ্রীয় দুই নেতাকে তারা প্রশ্ন করেন ভিসানীতি নিয়ে। জবাবে দুই নেতা বলেন, ভোটের আগে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সরকারের পক্ষে চলে আসবে। তোমরা এসব দুশ্চিন্তা না করে এলাকায় গিয়ে সংগঠন গোছাও, কাজ করো। নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করো। তৃণমূল পর্যায়ের ওই নেতারা বলেন, এলাকার নেতাকর্মীরা আমেরিকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। নেতাকর্মীরা তাদের কাছে জানার চেষ্টা করেন, আমেরিকার অবস্থান কী।

গত বুধবার সংসদের বাজেট অধিবেশনে মাগরিবের নামাজের বিরতিতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির সংসদ কার্যালয়ে আসেন কুষ্টিয়া, জামালপুর, বরিশাল ও চট্টগ্রামের ছয় এমপি। ওই সময় পেশাগত কাজে সেখানে ছিলেন এই প্রতিবেদকও। নেতার সঙ্গে ছয় এমপির আলাপেও আসে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি। সবাইকে থামিয়ে দিয়ে স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর ওই সদস্য বলেন, ভিসানীতির আওতায় ১৭ কোটি মানুষ। তোমাদের বাড়তি চিন্তার কোনো কারণ নেই। এলাকায় সংগঠন ঠিক রাখো, জনগণকে সময় দাও। নির্বাচনের প্রস্তুতি নাও।

এমপিরা বলেন, আমেরিকার সমালোচনা করে দলের দায়িত্বশীল নেতাদের বক্তব্য কতটা ঠিক?

পরে এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাড়া-মহল্লায় রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে সবাই স্বচ্ছন্দবোধ করে। সবাই সবার মতো করে বলে। অনেক সময় ভিত্তিহীন অনেক আলোচনাও উঠে সেসব স্থানে। এগুলো নিয়ে পরিষ্কার বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার বক্তব্য অনুসরণ করলেই নেতাকর্মীরা দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে পারবে।

দৈনিক দেশ রুপান্তর থেকে নেওয়া

আরও পড়ুন